অর্থনীতি

সারের দাম বৃদ্ধি, প্রভাব পড়েছে জনজীবনে

  নিজস্ব প্রতিবেদক: ১৩ এপ্রিল ২০২৩ , ৩:৪৩:৫০ প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম বেড়েছে কয়েক দফা। এর প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। হু হু করে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। মূল্য বেড়েছে বিভিন্ন সেবারও। নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্যের কারণে নাভিশ্বাস অবস্থা সাধারণ মানুষের। এমন অবস্থায় সব ধরনের সারের দাম কেজিতে ৫ টাকা করে বেড়েছে। যদিও আগের চেয়ে সরকার কম দামে বিদেশ থেকে এখন সার কিনতে পারছে। সারের দাম বাড়ানোর কারণে এখন  জনজীবনে আরেক দফা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সারের দাম বাড়ানোর কারণে কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান মানবজমিনকে বলেন, সামনে আউশ এবং পাট উৎপাদনের মৌসুম। এরপর আসছে আমন ধানের মৌসুম।

এই দু’টি সিজন সারের দাম বাড়ায় মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সারের দাম এক বছরে দুইবার বাড়ালো সরকার। আগেরবার ইউরিয়াতে ৬ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এবার ৫ টাকা করে সব সারের দাম বাড়ানো হলো। এতে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদনে। বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক এই সভাপতি বলেন, আমরা যখন বলছি, সারাবিশ্বে খাদ্য সংকট। খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে গেছে। সাপ্লাই কমে গেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো যারা খাদ্যশস্য আমদানির উপর নির্ভরশীল, তারা এখন খুবই সমস্যার মধ্যে আছে। কারণ খাদ্য তো এখন স্বাভাবিক না। দাম তো বেড়ে গেছে। তারা এখন (উন্নয়নশীল দেশ) আমদানির বিকল্প নীতি গ্রহণ করছে এবং উৎপাদন বাড়াতে চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ সরকার বলছে যে, এক ইঞ্চি জমিও যাতে পতিত না থাকে। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে। এ অবস্থায় উৎপাদনের উপকরণের দাম বাড়ানো হলো। এটা তো সাংঘর্ষিক কথা হয়ে গেল। তিনি বলেন, সারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে কৃষক নিরুৎসাহিত হবে। জমি পতিত ফেলে রাখবে। যেখানে আমরা উৎপাদন বাড়াতে চাচ্ছি, সেই সময়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। তিনি বলেন, একটা সময় মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ ইউরিয়া উৎপাদন হতো দেশে। কিন্তু এখন সেটি অনেক কমে গেছে। একে একে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। অপরদিকে, বিসিসিআই এর কাজ যেখানে উৎপাদন করা, তারা সেটি না করে সরাসরি সার আমদানি করছে। উচিত হবে আমদানির উপর নির্ভর না করে ইউরিয়ার উৎপাদন বাড়ানো। দরকার হলে আরও একাধিক সার কারখানা করুক বিসিআইসি।

ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, গত বছর কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো, ১৮ হাজার কোটির মতো খরচ হয়েছে। সামনের বছর অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখতে হবে কৃষিখাতে। আর এখন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নগদ সহায়তা দিতে হবে। কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষক যাতে ধানের উপযুক্ত দাম পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য কৃষকের নিকট থেকে বেশি দামে সরাসরি ধান কিনতে হবে। কিন্তু সরকার চাতাল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনলেও ধান কেনার বিষয়ে আগ্রহ নেই। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের যদি ভর্তুকি বাড়িয়ে দেয়া না হয় তাহলে কৃষক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবে। উৎপাদন কমে যাবে, খাদ্য সংকট সৃষ্টি হবে। এ কারণে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করতে হলে, দফায় দফায় উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি পরিহার করতে হবে। 
এদিকে সারের দাম বাড়ার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেছেন, এটা কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তবে আমি বলতে পারি সারের দাম বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। কতোটুকু পড়বে; এটা হিসেব কষে বলতে হবে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় কৃষক ও ডিলার পর্যায়ে প্রতি কেজি রাসায়নিক সারের দাম ৫ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।  ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের দাম কেজিতে ৫ টাকা বাড়িয়ে সোমবার আদেশ জারি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সোমবার থেকেই এ দাম কার্যকর হয়েছে বলে আদেশে জানানো হয়েছে।
সারের দাম বাড়ানোর আদেশে বলা হয়, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে সারের আমদানি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সারের বিক্রয়মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হলো।
এর আগে সারের মূল্য পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্তের কথা কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে জানায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
দাম বাড়ায় এখন থেকে কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া ও টিএসপির দাম ২২ টাকা থেকে ২৭ টাকা, ডিএপি ১৬ টাকা থেকে বেড়ে ২১ টাকা, এমওপি সারের দাম ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা হয়েছে।

অন্যদিকে ৫ টাকা বেড়ে ডিলার পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া ও টিএসপির দাম ২৫ টাকা, ডিএপির দাম ১৯ টাকা এবং প্রতি কেজি এমওপির দাম ১৮ টাকা হয়েছে। 
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের বর্তমান দাম ৪৮ টাকা, ডিএপি ৭০ টাকা, টিএসপি ৫০ টাকা আর এমওপি ৬০ টাকা। এর ফলে ৫ টাকা দাম বৃদ্ধির পরও সরকারকে প্রতি কেজি ইউরিয়াতে ২১ টাকা, ডিএপিতে ৪৯ টাকা, টিএসপিতে ২৩ টাকা এবং এমওপিতে ৪০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বিগত ৩ বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম প্রায় ৩-৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশে সারে দেয়া সরকারের ভর্তুকিও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ।
২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ভর্তুকিতে লেগেছিল ৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা; সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে লেগেছে ২৮ হাজার কোটি টাকা, আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। সারে ২০০৮-০৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের এখন পর্যন্ত সর্বমোট এক লাখ ১৯ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। 
সর্বশেষ দাম বাড়ানোর আগে গত ৩রা এপ্রিল কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছিলেন, এ বছর সারের দাম বাড়ানো হবে না। কিন্তু এর ৭ দিনের মধ্যেই সারের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে।

আরও খবর

Sponsered content