জাতীয়

স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে দশগুণ

  প্রতিনিধি ৩ আগস্ট ২০২৩ , ১০:৫৪:৪১ প্রিন্ট সংস্করণ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় আইভিফ্লুইডের (স্যালাইন) চাহিদা বেড়েছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১০ গুণ। কিন্তু সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) এই স্যালাইন তৈরি করে না। ফলে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনতে হচ্ছে এই কর্তৃপক্ষকে। এতে মোটা অঙ্কের অর্থের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে তাদের। যদিও চাহিদার পুরোটাই এই প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করার কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের দাবি-উৎপাদন অভাবেই মূলত চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। তবে ডিসেম্বর থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আইভিফ্লুইড তথা স্যালাইন উৎপাদনে যাবে সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ডেঙ্গু রোগীকে সুস্থ করে তুলতে দিনে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ ব্যাগ স্যালাইনের প্রয়োজন হয়। যা নিশ্চিত করতে না পারলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে রোগী।

ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালের দুই নম্বর ওয়ার্ডের ১২নং বিছানায় ভর্তি রয়েছে ৯ বছরের শিশু মাফরুহা আলম। মঙ্গলবার তার মা রাশেদা জান্নাত যুগান্তরকে বলেন, মেয়ে ২৫ জুলাই মঙ্গলবার থেকে জ্বরে ভুগছে। পরদিন জ্বরের সঙ্গে বমি ও নাক দিয়ে রক্তপাত শুরু হয়। আবদুল্লাহপুরে স্থানীয় ক্লিনিকে ডেঙ্গু পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। হাসপাতালে আনার পর প্রথমে কিডনি ওয়ার্ডে ভর্তি করে। ৫ দিন হলো এই ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে। এসময় প্রায় ২০ ব্যাগ আইভিফ্লুইড লেগেছে। ৫০০ মিলির এক ব্যাগ স্যালাইন ৫০ ও ১০০০ মি?লির ব্যাগ ১০০ টাকা করে কিনতে হচ্ছে। ভর্তির পর ওষুধ স্যালাইনসহ ৩০ হাজার টাকা শেষ হয়ে যায়।

সরকারের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এর আগে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ) আইভিফ্লুইড তথা স্যালাইন তৈরি করত। যেটি এখন বন্ধ। সরকার ভুল পলিসিতে আছে। ফলে প্রাইভেট থেকে কিনতে হচ্ছে। স্যালাইনসহ জরুরি ওষুধ উৎপাদনের ক্ষমতা ইডিসিএল ও আইপিএইচ’র রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটি প্রয়োজনীয় স্যালাইন তৈরি করতে পারছে না। বেসরকারি থেকে কিনে সরকারি হাসপাতাল দিলে অবশ্যই তা বাণিজ্যিকভাবে হচ্ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে হচ্ছে। রোগটির প্রধান চিকিৎসা ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট। সরকারিভাবে দ্রুত সব জরুরি ওষুধ উৎপাদনে যাওয়া উচিত।

এদিকে মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে গত একদিনে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট ২৬১ জনের মৃত্যু হলো। এ সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ২ হাজার ৫৮৪ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৫৩ জন রোগীই ঢাকার বাইরের। আর ঢাকায় ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৩১ জন রোগী। নতুন আক্রান্তসহ এ বছর ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৬ জনে।

গত বছর ৬২ হাজার ৩৮২ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে রেকর্ড ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৯ সালে দেশের ৬৪ জেলায় ১ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। সরকারি হিসাবে সে বছর মৃত্যু হয়েছিল ১৭৯ জনের।

এ বছরের জুলাই মাস শেষে ভর্তি রোগী ও মৃত্যুর এই সংখ্যা সামনে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৯ হাজার ২৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪ হাজার ৮৬৯ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ৪ হাজার ৩৯৫ জন।

এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। জুন মাসে যেখানে ৫ হাজার ৯৫৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, জুলাই মাসে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন রোগী। জুন মাসে ৩৪ জনের মৃত্যু হলেও জুলাই মাসে প্রাণ যায় ২০৪ জনের। মাসের হিসাবে জানুয়ারিতে ৫৬৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬ জন, মার্চে ১১১ জন, এপ্রিলে ১৪৩ জন, মে মাসে ১ হাজার ৩৬ জন এবং জুনে ৫ হাজার ৯৫৬ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে থেকে জানুয়ারিতে ৬, ফেব্রুয়ারিতে ৩, এপ্রিলে ও মে মাসে ২ জন করে এবং জুনে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গুতে এ বছর যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে ভুগছিলেন এবং শক সিনড্রোমে মারা যান।

মঙ্গলবার রাজধানীর মুগদা জেনারেল, সোহরাওয়ার্দী ও মিডফোর্ডসহ একাধিক হাসপাতাল ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে স্যালাইন সংকটের কথা জানা গেছে। স্যালাইন সরবরাহ প্রসঙ্গে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় আইভিফ্লুইডের প্রয়োজনীতা বাড়ছে। আগে ইডসিএলে মাসে একবার স্যালাইনের চাহিদা দেওয়া হতো। এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহে দিতে হচ্ছে। এখন ১৫ হাজার ১২০ ব্যাগ মজুত রয়েছে। যা সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ যাবে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৮০ ভাগেরই স্যালাইন প্রয়োজন। ফলে আগের চেয়ে ৩০ শতাংশ চাহিদা বেড়েছে।

সরকারের এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. এহসানুল কবির যুগান্তরকে বলেন, রোগীদের চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ফ্লুইড প্রয়োজন হয় যেমন, নরমাল স্যালাইন, ডিএনএস, হার্ডসন, প্লাজমাসল ইত্যাদি। কিন্তু ইডিসিএল স্যালাইন তৈরি করে না। সারা দেশে ইডসিএলের পাঁচটি প্ল্যান্টের মধ্যে গোপালগঞ্জে একটি ইউনিট রয়েছে। যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বেশকিছু ওষুধ তৈরি হচ্ছে। সেখানে শিগগিরই সব ধরনের ফ্লুইড তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলক প্রডাকশন ট্রায়ালে যাব। আশা করছি অক্টোবরে উৎপাদনে যেতে পারব।

গড়ে কি পরিমাণ ফ্লুইড চাহিদা বেড়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত বছরে ৬০ লাখ ব্যাগ স্যালাইনের চাহিদা ছিল। যারমধ্যে ৫৯ লাখ ৩৭ হাজার ব্যাগ দিতে পারছি। এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি ফ্লুইড লাগছে। ইডিসিএলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন না থাকায় বেরসকারি থেকে কেনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ডেক্সট্রোজেন ৫ শতাংশ ও সোডিয়াম ক্লোরাইড শূন্য দশমিক ৯ শতাংশের এক ব্যাগ ১০০০ মিলির স্যালাইন ৮৭ টাকা, বেবি স্যালাইন ৬৩ টাকা রাখা হচ্ছে। এভাবে ৫০০ মিলিসহ সব স্যালাইন স্বল্পদামে সব সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে।

ইডিসিএল সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, দেশে ৩৭টি সরকারি মেডিকল কলেজ ছাড়াও হাসপাতাল বেড়েছে। কিন্তু স্যালাইন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়েনি। আপাতত বেক্সিমকো, একমি, পপুলার, অপসোনিন, ওরিয়ন ও লিবরা এই ৬টি কোম্পানি থেকে কিনে দিচ্ছি। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় যেসব হাসপাতালে চাহিদা বেশি তারা বাইরে থেকে কিনতে চাইলে এনওসি দেওয়া হচ্ছে।

আরও খবর

Sponsered content